বারবার দলের স্বার্থে বিসর্জন: এবার সিলেট-৪ আসনে জামানই ‘হট ফেভারিট’

বারবার দলের স্বার্থে বিসর্জন: এবার সিলেট-৪ আসনে জামানই ‘হট ফেভারিট’

বিশেষ প্রতিবেদন
সিলেটের রাজনীতিতে তিনি পরিচিত ‘রাজপথের লড়াকু সৈনিক’ হিসেবে। যার নাম শুনলে একসময় প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শিবিরের বুকে কাঁপন ধরত, সেই অগ্নিপরীক্ষিত জননেতা অ্যাডভোকেট শামসুজ্জামান জামান এবার ভোটের মাঠে। সিলেট-৪ (কোম্পানীগঞ্জ-গোয়াইনঘাট-জৈন্তাপুর) আসনে বিএনপির দলীয় মনোনয়নের দৌড়ে তিনি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। তাকে ঘিরে কেবল বিরোধী শিবিরেই নয়, খোদ নিজ দলের অনেক হেভিওয়েট প্রার্থীর মাঝেও দেখা দিয়েছে ‘জামান আতঙ্ক’।

সিলেটের রাজনীতিতে ‘জামান গ্রুপ’ একটি ব্র্যান্ড। গত ১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসনকালের চরম দুঃসময়ে, যখন বাঘা বাঘা অনেক নেতা আত্মগোপনে কিংবা নিরাপদ অবস্থানে ছিলেন, তখনো রাজপথের দখল ছিল শামসুজ্জামান জামানের হাতে। বিশেষ করে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি, বেগম খালেদা জিয়ার রায় ঘোষণার দিন ঐতিহাসিক কোর্ট পয়েন্ট ও বন্দরবাজার এলাকা দখলে রেখে পুলিশ ও ছাত্রলীগের ত্রিমুখী আক্রমণের মুখেও তিনি যে প্রতিরোধ গড়েছিলেন, তা সিলেটবাসী আজও ভোলেনি।

দলের স্বার্থে বারবার নিজের নিশ্চিত বিজয় ও ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়েছেন অ্যাডভোকেট জামান। ২০১৪ সালের সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে তিনি ছিলেন তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয় মেয়র প্রার্থী। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বর্তমান বিএনপি নেতা আরিফুল হক চৌধুরী। কিন্তু দলীয় প্রধানের নির্দেশে শেষ মুহূর্তে তিনি সরে দাঁড়ান। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সেদিন জামান ছাড় না দিলে আরিফুল হক চৌধুরীর মেয়র হওয়াটা স্বপ্নই থাকতো।

একইভাবে ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে সিলেট-৪ আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন প্রায় নিশ্চিত ছিল তার। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশ এবং সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম দিলদার হোসেন সেলিমের প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান এবং সেলিমের বিজয়ের জন্য কাজ করেন।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানেও শামসুজ্জামান জামান ছিলেন সম্মুখসারির যোদ্ধা। হাসিনা সরকারের পতনের আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে বিদ্ধ হয়েও তিনি রাজপথ ছাড়েননি। অসুস্থ মায়ের সেবা করার সুযোগ না পাওয়া, ব্যক্তিগত সুখ বিসর্জন দেওয়া এবং গত দেড় যুগে অর্ধশতাধিক মামলার আসামি হয়েও আদর্শচ্যুত না হওয়া এই নেতাকে এখন তৃণমূলের কর্মীরা নিজেদের ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে দেখছেন।

সিলেট-৪ আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, মিফতাহ সিদ্দিকী ও আব্দুল হাকিম চৌধুরীর নাম শোনা গেলেও মাঠের সমীকরণ ভিন্ন। সূত্রমতে, এই আসনে শক্তিশালী অবস্থানে থাকা জামায়াতে ইসলামী একমাত্র শামসুজ্জামান জামানকেই তাদের প্রধান ‘হেভিওয়েট’ বাধা মনে করছে। অন্য প্রার্থীদের তারা খুব একটা ধর্তব্যের মধ্যে আনছে না।

তৃণমূল বিএনপি কর্মীদের মাঝেও আরিফুল হক চৌধুরীর ‘স্বঘোষিত’ প্রার্থিতা নিয়ে চাপা ক্ষোভ রয়েছে। সীমান্ত জনপদের মানুষের দাবি—প্রয়াত নেতা দিলদার হোসেন সেলিমের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে ত্যাগের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ জামানই ধানের শীষের প্রকৃত কান্ডারী।

টানা ৩০ বছর ধরে কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুরের মাটি ও মানুষের সঙ্গে মিশে থাকা জামান প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন—নির্বাচিত হলে খনিজ সম্পদ ও পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে তিনি এই জনপদকে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করবেন।

রাজনীতির মাঠে অ্যাডভোকেট শামসুজ্জামান জামান এখন এক নীরব ঝড়ের নাম। বারবার দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করা এই নেতা এবার দলের কাছ থেকে তার ত্যাগের প্রতিদান পাবেন কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

মাঠের পরিস্থিতি: বর্তমানে এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন চাইছেন সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীসহ কয়েকজন। তবে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মতে, আরিফুল হক চৌধুরীর হঠাৎ এই আসনে প্রার্থিতা ঘোষণা এবং অন্যদের জনসম্পৃক্ততার অভাব কর্মীদের হতাশ করেছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীও মনে করছে, এই আসনে জামান মনোনয়ন পেলে তিনিই হবেন একমাত্র কঠিন প্রতিপক্ষ।

তৃণমূলের দাবি, বারবার অন্যের জন্য ছাড় দেওয়া জামানকে এবার মূল্যায়ন না করলে অবিচার করা হবে। খনিজ ও পর্যটন সমৃদ্ধ এই জনপদকে আধুনিক রূপে গড়তে জামানের বিকল্প দেখছেন না তারা।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.




© All rights reserved ©ekusheysylhet.com
Design BY DHAKA-HOST-BD
weeefff